উড়নচণ্ডী

This slideshow requires JavaScript.

 

 

“Some birds aren’t meant to be caged… their feathers are too bright.”

কিছু কিছু বিষয় থাকে যেগুলো অবাধ হলে ভালো লাগে দেখতে। ঝর্ণার জল, হরিণের ছন্দময় চলে যাওয়া। তেমনই একটি বিষয় হল স্বাধীনতা। স্বাধীনতা অবাধ হবার দাবী রাখে। যার কোন দেশ-কাল-সীমানা নেই। বহুদিন আগে ‘রিফিউজি’ ছবির একটি গানের কথায় এর মূল আমরা বুঝতে পারি, যেখানে বলা হয় পৃথিবীতে এইরকমের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করবার ক্ষমতা মাত্র তিনটি জিনিসের রয়েছে। এক হল পাখি, দুই নদীর জলধারা, তিন হাওয়ার স্রোত। বস্তুত, জগতসংসারের অন্যতম সত্য ঠিক এই গানটিতেই লুকিয়ে আছে।

 

মানুষ সততই স্বাধীনতা এবং মুক্তিকে কামনা করে। ধীরে ধীরে তার সমগ্র জীবন ও যাপনের মধ্যে দিয়ে সেইদিকে অগ্রসর হতে সচেষ্ট হয়। সমগ্র জীবন নিয়ে মোহানার কাছে বসে থাকতে থাকতে তার ভেতর জমা হয়ে থাকা পাথরগুলোর সঞ্চয় হতে থাকে। সমুদ্রে গিয়ে যার মুক্তি। হঠাতই স্বাধীনতা এবং মুক্তি নিয়ে লিখতে বসবার কারণ এটাই, যে, এই একটি বিষয় যেকোন মানুষের বোধের ভেতরে জীবনের কোন না কোন সময়ে বাস করে। ধীরে ধীরে সেই স্বাধীনতা বোধ জমতে জমতে ক্রমে অট্টালিকার আকার নিয়ে ফেলে। আর সামনে দিয়ে কোন দইওয়ালা ডাক দিয়ে চলে গেলে আমরা জানালার এই পারের মানুষেরা সর্বদা সেই ডাকে সাড়া দেবার জন্য ছটফট করি। তাহলে কি স্বাধীনতা শুধু বাইরের কোন অনুঘটকের প্রত্যাশা করে। হ্যাঁ এবং একইসাথে না। না, কারণ একবার ভেতরে কারোর মুক্তি পাবার বোধ জেগে উঠলে মানুষ দেওয়াল কেটে বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ মানুষ প্রকৃত অর্থেই ভবিষ্যৎ সুদিনের অপেক্ষা করে, আশা করে। এবং এখানেই সেই বিখ্যাত ছবি শশ্যাঙ্ক রিডেম্পশানের বিখ্যাত লাইনটিকে মনে করতে হয়, “Remember, hope is a good thing, may be the best of things, and  no good thing ever dies.”

 

উড়নচণ্ডী ছবিটিও সেই একই কথা বলে। অভিষেক সাহার অনবদ্য পরিচালনা, সৌমিক হালদারের কিছু কিছু জায়গায় অসামান্য সিনেমাটোগ্রাফি, তন্ময় চক্রবর্তীর অসাধারন হাতে আঁকা ছবির মতন দৃশ্য এবং দেবজ্যোতি মিশ্রর সুরারোপ এই ছবিটিকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে দাঁড়িয়ে প্রতিটা চরিত্র এসে নিজেদের কথাটুকু বলে চলে গেলে আমাদের শুধু ভালো লাগা পড়ে থাকে আর মনের অনেক অনেক ভেতরে পড়ে থাকে উড়াল দেবার অদম্য ইচ্ছা। উড়নচণ্ডী বাংলা চলচ্চিত্র জগতে সেইরকমই একটা ছবি যাকে ‘রোড মুভি’র আওতায় ফেলা যায়।  এ ছবির সমস্তটাই বাইরে শ্যুট করা হয়েচে। প্রকৃতির সাথে মানুষের যে স্বাভাবিক সম্পর্ক সেই সহজ সত্যিটা এই ছবিতে খুবই ঝরঝরে এবং পরিষ্কার। মেদহীন, সহজ সংলাপ এ ছবির অন্যতম বিশিষ্টতা, যা উড়ণচণ্ডীকে মানুষের অনেক কাছে নিয়ে যেতে পারে বলেই বিশ্বাস। কারণ  প্রকৃতপক্ষে মানুষ সহজ এবং স্বাভাবিক। আর সেখানেই সুন্দর বাস করে। এই ছবির মূল সুরটুকু তাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অক্ষত থেকে গেছে।

 

সমস্ত বাঁধন ফেলে সামনে ছুটে যাওয়ার গল্প উড়নচণ্ডী, যেখানে খুব অদ্ভুতভাবেই একটি ট্রাক অর্থাৎ মূলত একটি যন্ত্র কাহিনীর মূল চারটি চরিত্র অর্থাৎ বিন্দি (সুদীপ্তা চক্রবর্তী), সাবিত্রী (চিত্রা সেন), ছোটু(অমর্ত্য), মিনু (রাজনন্দিনী পাল) এদের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠে। শিকড়ের সমস্ত টান ফেলে রেখে আপন ভাগ্য জয় করবার লক্ষ্যে এই চারটি প্রাণ নিজের ইচ্ছেতে একটা ভালো এবং সুস্থ জীবন বাঁচবার স্বপ্ন দেখে। উড়নচণ্ডী আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায় কীভাবে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে হয়। কীভাবে সম্পূর্ণ অপরিচিতরাও আমাদের সবচে’ আপন হয়ে ওঠে। উড়নচণ্ডী একটা উচ্ছ্বাসের নাম। আর তার সমগ্র ক্যানভাসে যেন মুক্তি স্বাদ আঁকা হয়ে পড়ে থাকে। এই ছবিটি বহু মানুষকে সাহস দিতে পারে। বহু নারীকে জীবনের অন্যতম পরম প্রাপ্তি অর্থাৎ স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ এবং এক অন্য পুরুলিয়াকে আবিষ্কার করা গেছে এই ছবির মধ্যে দিয়ে।

জীবনের যাত্রাপথে মুক্তি ও স্বাধীনতা উদযাপনের এক অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়াক উড়নচণ্ডী।

1620381_484796671621276_2018209735_n

Advertisements